সর্বশেষ আপডেট : ৯ মিনিট ৫৫ সেকেন্ড আগে
মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

লাখ লাখ বাংলাদেশি নাগরিকত্ব হারাতে পারেন

14897_31নিউজ ডেস্ক::
বৃটেনের ট্রাইব্যুনাল জাজ ব্যারিস্টার নজরুল খসরু বলেছেন, প্রস্তাবিত বাংলাদেশ নাগরিকত্ব আইন অনুমোদন ও কার্যকর হলে বহির্বিশ্বে বসবাসরত লাখ লাখ বাংলাদেশির সন্তান বাংলাদেশের নাগরিকত্ব হারাতে পারেন। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক প্রবাসী দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হবে। তাছাড়া বাংলাদেশে রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়বে অনেক মানুষ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে কোনো নাগরিককে আইন করে রাষ্ট্রহীন করার প্রভিশন নেই। নজরুল খসরু গত ৬ই মে লন্ডনে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। নিচে তার সাক্ষাৎকারটি প্রশ্নোত্তর আকারে তুলে ধরা হলো। খবর মানবজমিন
: ‘বাংলাদেশ নাগরিকত্ব আইনটি কী একটু বিশ্লেষণ করবেন?
নজরুল খসরু: এই আইন অনুমোদন ও কার্যকর হলে বহির্বিশ্বে বসবাসরত দ্বৈত নাগরিকদের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পুনরায় রেজিস্ট্রি করতে হবে। তবে তারা যদি নাম রেজিস্ট্রি না করেন তাহলে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবেন কি-না তা আইনে পরিষ্কার নয়। তাছাড়া এই রেজিস্ট্রেশন স্থানীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে করা যাবে কি-না তাও আইনে উল্লেখ নেই।
: আচ্ছা, যারা বহির্বিশ্বে বংশসূত্রে বাংলাদেশি নাগরিক (দ্বিতীয় প্রজন্ম) তাদের কী হবে?
নজরুল খসরু: তাদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেতে হলে প্রমাণ করতে হবে যে, তাদের পিতা বা মাতা এই আইন কার্যকর হওয়ার পূর্বে বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন। তাছাড়া এই আইন প্রণয়নের দুই বছরের মধ্যে নিজেদের নাম স্থানীয় হাইকমিশনে রেজিস্ট্রি করতে হবে।
: এ ক্ষেত্রে তৃতীয় প্রজন্মের কী হবে?
নজরুল খসরু: তৃতীয় প্রজন্মের জন্য আইনটি খুবই উদ্বেগজনক। যেহেতু তাদের পিতামাতা এই আইন কার্যকর হওয়ার পরে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিয়েছেন সেহেতু তাদের নাগরিক হওয়ার সুযোগ থাকবে না। কারণ আইনে বলা হয়েছে, কেউ বাংলাদেশের নাগরিক হতে হলে প্রমাণ করতে হবে যে, তার পিতা বা মাতা উক্ত আইন হওয়ার পূর্বে বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন। সুতরাং তৃতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশিদের আইনের চোখে বিদেশি হিসেবে গণ্য করা হতে পারে।
: আইনে বাংলাদেশের নাগরিকদের সম্পর্কে আর কী কী বলা হয়েছে?
নজরুল খসরু: বাংলাদেশি রোহিঙ্গা এবং উর্দুভাষী বাংলাদেশিদের নাগরিক হওয়ার ব্যাপারে সীমাবদ্ধতা থাকবে। তাছাড়া বাংলাদেশের কোনো যুদ্ধে যারা বিরোধিতা করেছেন তাদের সন্তানদের নাগরিকত্ব চলে যাবে। তবে কৌতূহলের বিষয় হচ্ছে যে, যারা যুদ্ধে বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছেন তাদের ব্যাপারে আইনে কিছুই বলা হয়নি।
: এই আইন পাস হলে প্রবাসীরা কী কী অসুবিধার সম্মুখীন হবেন বলে আপনি মনে করেন?
নজরুল খসরু: এই আইনে প্রবাসীদের জন্য অনেক নেতিবাচক দিক আছে। প্রবাসীরা এই আইনে মারাত্মক বিড়ম্বনায় পড়বেন। বিশেষ করে ব্রিটেনসহ ইউরোপ আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় নাগরিকত্ব নিয়ে যারা বসবাস করছেন তারা মারাত্মক সমস্যায় পড়বেন। যাদের দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকবে তারা বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন না। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হতে পারবেন না। কোনো সরকারি চাকরি পাবেন না। স্থানীয় সরকার নির্বাচন যেমন: সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। তাছাড়া কোনো রাজনৈতিক সংগঠনও করতে পারবে না।
: কেউ বিদেশি নাগরিকত্ব ছেড়ে যদি শুধু বাংলাদেশের নাগরিকত্ব রাখে তাহলে কি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
নজরুল খসরু: এ ব্যাপারে এই আইনে পরিষ্কার করে কিছু বলা হয়নি। তবে সংবিধানে আছে, বিদেশি নাগরিকত্ব ছেড়ে দিলে তিনি সংসদীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
: যদি কেউ আইন ভঙ্গ করে তাহলে তার জন্য কি কোনো শাস্তি আছে।
নজরুল খসরু: এটি জামিন অযোগ্য অপরাধ। সাধারণত হত্যা ধর্ষণজনিত অপরাধ জামিন অযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। এবার নাগরিত্ব আইন ভঙ্গ করলে জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। যেকোনো থানায় পুলিশ কর্মকর্তা কিংবা কোনো ব্যক্তি বাদী হয়ে প্রবাসীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে। দেশে রাজনীতি করলে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে।
: এই আইনের মাধ্যমে প্রবাসীরা কি হয়রানির শিকার হবেন বলে আপনি মনে করেন?
নজরুল খসরু: বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে পারেন। এটি হবে প্রবাসীদের হয়রানি করার একটি সহজ মাধ্যম। অনেকের জন্য ব্যক্তিগত শত্রুতায় প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। পুলিশ যে কারো বিরুদ্ধে মামলার ভয় দেখিয়ে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করতে পারে।
: আর কী কী সমস্যার সম্মুখীন হবেন?
নজরুল ইসলাম: আইনি জটিলতায় যারা বাংলাদেশের নাগরিক হতে পারবেন না, বা যারা তৃতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশি তাদেরকে বিদেশি নাগরিক হিসেবে ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে যেতে হবে। বিদেশি নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশে গেলে নিজের পৈত্রিক সম্পত্তিতে সহজে অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। কারণ বিদেশি নাগরিকের সুযোগ-সুবিধা একেবারে সীমিত।
: আইন কার্যকর হলে বাংলাদেশ কি কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে?
নজরুল খসরু: প্রবাসীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। যেহেতু তাদের বংশধররা বাংলাদেশের নাগরিক হতে পারবে না, তাই তারা বাংলাদেশের সম্পদ বিক্রি করে নিয়ে আসতে পারেন। বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের যে একটি আবেগের সম্পর্ক আছে তা শিথিল হয়ে যাবে। ফলে বাংলাদেশের বিভিন্ন দুর্যোগে যেভাবে প্রবাসীরা এগিয়ে আসেন সেভাবে হয়তো এগিয়ে আসার মানসিকতা থাকবে না। প্রবাসীরা একটি দক্ষ জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশ তাদের দক্ষতার সুফল ভোগের সুযোগ হারাবে।
: আইনে প্রবাসীদের জন্য এত কড়াকড়ির কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে কী?
নজরুল খসরু: সাধারণত খসড়া আইনে ব্যাখ্যা থাকে, কিন্তু এই আইনে কোনো ব্যাখ্যা নেই। উন্নয়নশীল দেশগুলো আজকাল বিদেশে থাকা তাদের নাগরিকদের স্বদেশমুখী করতে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে। আর বাংলাদেশে প্রবাসীদের দূরে ঠেলে দেয়া হয়। এটা কেন তা আমার বোধগম্য নয়। তবে এ প্রসঙ্গে জাস্টিস ঈমান আলী ভাইর কাছ থেকে শোনা একটি গল্প উল্লেখ করতে চাই। ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তিনি লন্ডনে ছিলেন। তখন তিনি ১৫-১৬ বছরের ছাত্র। যুদ্ধের জন্য প্রবাসীদের কাছে থেকে আর্থিক সাহায্য সংগ্রহ করতেন। তখনকার সময় প্রবাসীরা সপ্তাহে ১৮-১৯ পাউন্ড রোজি করতেন। শুক্রবার ছিল তাদের পেমেন্ট ডে। ওইদিন বেতন পেতেন। বেতনের পয়সা যেভাবে পলিথিনের প্যাকেটে দেয়া হতো সেভাবেই তারা নিয়ে আসতেন। তা থেকে ৪-৫ পাউন্ড খরচের জন্য রেখে বাকিটুকু তারা দিয়ে দিতেন। একজন লোক ১৮-১৯ পাউন্ডের পুরো প্যাকেটটিই তার হাতে তুলে দিয়ে যেতেন। তিনি আশ্চর্য হয়ে একদিন জানতে চাইলেন আচ্ছা, আপনি যে সপ্তাহের সমুদয় বেতন তুলে দেন তো আপনি চলেন কিভাবে। জবাবে, ওই ব্যক্তি বলেছিলেন, তিনি তার বড় ভাইয়ের সঙ্গে থাকেন। খাওয়া-দাওয়া ওখানে হয়ে যায়। তার বেঁচে থাকার খরচ যখন ভাইয়ের মাধ্যমে হয়ে যাচ্ছে, তখন অন্য কোনো খরচের চিন্তার চেয়ে এই অবস্থায় দেশকে সাহায্য করাটাই বড়। এই গল্পটি শুনে আমি বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা এভাবে সাহায্য করেছেন। আর আজ আইন করে তাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের নাগরিকত্ব অধিকার কেড়ে নেয়া হবে। এটা মেনে নেয়া যায় না।
: কোনো কোনো দেশ প্রবাসীদের বেশি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে?
নজরুল খসরু: কয়েকটি দেশের নাম বলবো। যেসব দেশে প্রবাসীদের জন্য তাদের সংসদে রিজার্ভ সিট রেখেছে। প্রবাসী কৌটায় নির্বাচন করে সাংসদ হতে পারেন তারা। যেমন ক্রয়েশিয়া, এংগোলিয়া, ফ্রান্স, ইতালি, কলম্বিয়া, আলজেরিয়া, মুজাম্বিক, পর্তুগাল ইত্যাদি দেশ তাদের প্রবাসীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দেশে টানার চেষ্টা করে। কিন্তু বাংলাদেশে তাদের প্রবাসী নাগরিকদের দেশ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা চলছে। এটা দুঃখজনক।
: বাংলাদেশের সংবিধানে এ ধরনের আইন প্রণয়নের বৈধতা কতটুকু?
নজরুল খসরু: সংবিধানে বলা আছে, বাংলাদেশের সকল নাগরিক সমান। প্রত্যেকে সমান অধিকার ভোগ করবেন। চাকরি ও নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য করা যাবে না। দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বলতে সংবিধানে কিছু নেই। সুতরাং আইন করে কারো নাগরিকত্ব অধিকার হরণ করা বা কাউকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা সংবিধান পরিপন্থি।
: জনাব নজরুল খসরু, এই আইনের কোনো ভালো দিক আছে কী।
নজরুল খসরু: ভালো দিক বলতে আমি যা দেখি তা হচ্ছে- বাংলাদেশে এতদিন নিজস্ব কোনো নাগরিকত্ব আইন ছিল না। এবার একটি আইন হচ্ছে। যার দরকার ছিল। এক সময় ছিল পাকিস্তান নাগরিকত্ব আইন ১৯৫১। ’৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ল’কন্টিনিউয়েন্স এন্ড এনফোর্সমেন্ট অধ্যাদেশ জারি করে এই আইন বৈধ করা হয়। এরপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধারা ও উপধারা সংযুক্ত করে এই আইন দিয়েই দেশ চলছিল। এখন একটি পূর্ণাঙ্গ আইন হচ্ছে তা ভালো কথা। তাছাড়া, দ্বৈত নাগরিকত্বের বিধানটি প্রথমবারের মতো একটি আইনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে।

: আইন হলে বহির্বিশ্বে কত লোক ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করেন।
নজরুল খসরু: বহির্বিশ্বে প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশি বসবাস করেন। তবে সকল ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। যে সব দেশে নাগরিকত্ব নিয়ে বসবাস করছেন সেই দেশের প্রবাসীরা ভোগান্তিতে পড়বেন। কারণ তারা দ্বৈত নাগরিক। যেমন ইউরোপ, আমেরিকা অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকরা বিড়ম্বনার শিকার হবেন। মধ্যপ্রাচ্য কিংবা অন্যান্য দেশ যেখানে নাগরিকত্ব দেয়া হয় না সে দেশের প্রবাসীদের জন্য তেমন কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। সেই হিসেবে ১৮ লাখ প্রবাসী বাঙালি সমস্যার মুখোমুখি হবেন। কারণ তারা ইউরোপ, আমেরিকা অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব নিয়ে বসবাস করেন। এই সংখ্যার মধ্যে শুধু ব্রিটেনে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সাড়ে ৭ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি।
: আইনের ব্যাপারে আপনার সর্বশেষ পরামর্শ কী।
নজরুল খসরু: আমার পরামর্শ হবে তড়িঘড়ি করে এটি যেন জুন মাসে সংসদীয় অধিবেশনে না নিয়ে আসা হয়। এটার প্রভাব পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। প্রবাসী এবং অন্যান্য আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে এটাকে যথাযথভাবে সংশোধন করে সংসদে উত্থাপন করা উচিত।

: জনাব নজরুল খসরু আমাদেরকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
নজরুল খসরু: আপনাকেও ধন্যবাদ।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: