সর্বশেষ আপডেট : ৬ মিনিট ৩১ সেকেন্ড আগে
সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

শিক্ষককে গণপিটুনি ও কানে ধরে উঠবসের নেপথ্যে

2016_05_15_01_11_43_UDJ9Ozu4r7xhWW9AMbHHz4DqdiMuAS_original-696x228নিউজ ডেস্ক::
নারায়ণগঞ্জ বন্দরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে স্কুলের প্রধান শিক্ষককে গণপিটুনি এবং পরে এমপির সামনে কানে ধরে উঠবস করার ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেইসঙ্গে বিলুপ্ত করা হয়েছে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি।

স্কুলের পাশের মসজিদের ইমাম ও স্কুলের ধর্মীয় শিক্ষক জানিয়েছেন, গণপিটুনির ঘটনার আগে তারা জানতেন না যে, ধর্ম অবমাননার কোনো ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে, আহত প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত জানিয়েছেন, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সঙ্গে বিরোধের জের ধরে কমিটি পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়িয়ে তাকে হত্যার চেষ্টা করে।

ঘটনার ব্যাপারে মামলা করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি নিজেই নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছি। তাই মামলা করার বিষয় ভাবতে পারছি না।’

তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি দাবি করে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।

নারায়ণগঞ্জ শহর থেকে শীতলক্ষ্যা নদী পার হয়ে বন্দর উপজেলা। বন্দর উপজেলার দক্ষিণের শেষ প্রান্ত কলাগাছিয়া ইউনিয়নের কল্যানদি গ্রাম।

ওই এলাকার পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত। গত শুক্রবার ইসলাম ধর্ম ও আল্লাহ নিয়ে কটূক্তি করেছেন-এমন গুজবে উত্তেজিত এলাকাবাসী তাকে গণপিটুনি দিয়ে গুরুতর আহত করে।

পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) সেলিম ওসমান একই অভিযোগে তাকে কানে ধরে উঠবস করিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। তাকে নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুরের ৩শ’ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এ ঘটনা ঘটলেও গণপিটুনির ঘটনার আগে ঘটনা জানতেন না পার্শ্ববর্তী কল্যানদি বায়তুল আতিক জামে মসজিদের ইমাম মাহমুদুল হাসান।

তিনি জানান, সকাল ১০টার দিকে স্কুলের কয়েকজন ছাত্র এসে তার কাছে মসজিদের চাবি চায়। তিনি তাদের জানান, শুক্রবার মসজিদ খোলাই থাকে। চাবির প্রয়োজন নেই। এরপর ছাত্ররা গিয়ে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেয়, ‘আল্লাহ ও আল্লাহর রসুল (সা.) নিয়ে প্রধান শিক্ষক কটূক্তি করেছেন। স্কুলের ওপর হামলা চলছে। আপনারা তাড়াতাড়ি সমাধান দেন। মাতব্বর সাহেবরা কে কোথায় আছেন, তাড়াতাড়ি আসুন। হেডমাস্টার কটূক্তি করার কারণে ছাত্ররা উত্তেজিত হয়েছে। স্কুল রক্ষা করুন।’

তিনি বলেন, ‘মাইকে কয়েকজন ছাত্রের কণ্ঠ আমি শুনেছি। এ সময় আমরা জানতে পারি, তিনি ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করেছেন। এলাকার অনেকেই তা শুনেছে।’

এ ব্যাপারে কথা হয় স্কুলের ইসলাম ধর্মের শিক্ষক ও শিক্ষক প্রতিনিধি সৈয়দ বোরহানুল ইসলামের সঙ্গে।

তিনি জানান, প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অবমাননার কোনো অভিযোগ তিনি আগে শোনেননি। ঘটনার পরে স্যার রিফাতের বাসায় গিয়ে তার মার কাছে তাকে পেটানোর জন্য দুঃখ প্রকাশ করে। আমিও তখন তার সাথে গিয়েছিলাম। কিন্তু রিফাত বা তার মা তখন আমাদের কাছে এমন কোন অভিযোগ করেননি। এমন কোন রেকর্ডও তার নেই।

একই কথা জানায় স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র রিফাত হাসানকে মারধরের সময় সেখানে উপস্থিত থাকা সহকারী শিক্ষক উত্তম কুমার গুহ।

তিনি বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক রিফাতকে মারধর করেছে এটা সত্য। কিন্তু তিনি ধর্মীয় বিষয়ে কোনো কথা বলেননি। ওই সময় আমি ছাত্রদের ক্লাশ নিচ্ছিলাম।’

নারায়ণগঞ্জ ৩শ’শয্যা হাসপাতালের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের ১৫ নম্বর বেডে চিকিৎসা নিচ্ছেন আহত প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত।

তিনি অভিযোগ করে জানান, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ফারুকুল ইসলাম তার বোন পারভীন আক্তারকে স্কুলের হেডমাস্টার পদে বসানোর জন্য বেশ কয়েক বছর ধরে চেষ্টা করে আসছিল। কিন্তু তিনি রাজি হচ্ছিলেন না স্কুলের দায়িত্ব ছেড়ে দিতে। এ ছাড়া ম্যানেজিং কমিটির বিভিন্ন অপকর্মে তিনি বাধা দিচ্ছিলেন। এ জন্য পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যার জন্য ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়ানো হয়।

প্রসঙ্গত, গত ৮ মে দশম শ্রেণির ছাত্র রিফাত ক্লাসে বসে কুকিলের ডাক, কাকের ডাক দিয়ে দুষ্টুমি করছিল। প্রধান শিক্ষক নিষেধ করলেও সে শুনেনি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে প্রধান শিক্ষক রিফাতকে চর মারেন। এ বিষয়টিকে অজুহাত করে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ফারুকুল ইসলাম, কমিটির সদস্য ইউএনও অফিসের পিয়ন মিজানুর রহমান, মতিউর রহমান মিজু ও মোবারক মিলে গুজব রটায় যে, রিফাতকে মারার সময় তিনি ইসলাম ধর্মবিরোধী কথা বলেছেন। তারা রিফাতের মা রিনা বেগমকে দিয়ে ১৩ মে শুক্রবার এ বিষয়ে একটি অভিযোগ করায়।

শুক্রবার তাকে (প্রধান শিক্ষক) স্কুলে ডেকে আনা হয় এ বলে যে, স্কুলে এমপি সাহেবের দেয়া পঞ্চাশ লাখ টাকা উন্নয়নের কাজে ব্যবহারের ব্যাপারে মিটিং হবে। স্কুলে আসার কিছুক্ষণের মধ্যে পার্শ্ববর্তী মসজিদের মাইকে তিনি ধর্ম অবমাননা করেছেন বলে প্রচার করে জনসাধারণকে স্কুলে আসার আহ্বান জানানো হয়।

এ ব্যাপারে মামলা করবেন কিনা জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘আমি নিজেই নিরাপত্তাহীনতায় আছি। তাই মামলা করার বিষয় ভাবতে পারছি না।’

তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি দাবি করে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।

শনিবার ওই স্কুল ও এলাকায় গিয়ে পাওয়া যায়নি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ফারুকুল ইসলামকে।

তার চাচাতো বোন স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষিকা পারভীন আক্তার বলেন, ‘এ ঘটনার সঙ্গে আমি জড়িত না। আমার যোগ্যতা থাকলে আমি প্রধান শিক্ষক হব। না হলে সহকারী প্রধান শিক্ষকই থাকব। তাকে (প্রধান শিক্ষক) অপসারণ করার কোনো পরিকল্পনা আমার ছিল না।’

ট্রেনিংয়ে থাকায় তিনি তার স্যারকে (প্রধান শিক্ষক) দেখতে যেতে পারেননি বলে জানান পারভীন।

স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির আরেক সদস্য মোবারক হোসেন জানান, রিফাতের বাবা-মা পাঞ্চায়েতের কাছেও গেছে। কিন্তু তারা কারও কাছেই বলেনি যে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করছে। বলেছে যে, মেরেছে। তারা মারের বিচার চেয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ঘটনার পর ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এলাকায় ছিল না বলে আমরা শুনেছি।’

ঘটনা তদন্তে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আ খ ম নুরুল আলমকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী অফিসার মৌসুমী হাবিব।

নুরুল আলম বলেন, ছাত্রকে মারধরের অভিযোগের সত্যতার প্রমাণ পেয়েছি। ধর্মীয় বিষয়ে কটূক্তির অভিযোগের ব্যাপারে তদন্ত করা হচ্ছে। ছাত্র ও শিক্ষকদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আগামী দুই দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করা হবে।

বন্দর থানার ওসি আবুল কালাম ঘটনা সম্পর্কে বলেন, প্রধান শিক্ষককে মারধর করা হচ্ছে শুনে আমরা গিয়ে উদ্ধার করি। তাকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে পুলিশ হেফাজতে। তবে এ ব্যাপারে কোনো মামলা হয়নি। কেউ মামলা করতে আসেনি।

এ ব্যাপারে এমপি সেলিম ওসমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের পর কমিটির ব্যাপারে ব্যবস্থা হবে।

তিনি বলেন, ‘আমি জানতে পারি যে, ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওই প্রধান শিক্ষককে মারধর করা হচ্ছে। খবর পেয়ে আমি সেখানে পুলিশ পাঠাই। পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে। কিন্তু তাকে বাইরে নিয়ে আসতে পারছিল না। কয়েক হাজার লোক তাদের ঘিরে রেখেছিল। খবর পেয়ে আমি সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কানে ধরে উঠবস করিয়ে তাকে উদ্ধার করি। এ ছাড়া তাকে জনরোষের হাত থেকে উদ্ধার করা কোনোভাবেই সম্ভব হতো না। প্রধান শিক্ষকের শাস্তির পর বিক্ষুব্ধ জনতা শান্ত হলে তাকে থানায় নিয়ে নিরাপত্তা হেফাজতের ব্যবস্থা করি। তিনি বর্তমানে হাসপাতালে নিরাপত্তা হেফাজতে রয়েছেন।’

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: