সর্বশেষ আপডেট : ৪ ঘন্টা আগে
শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

গবাদিপশু সেবিকা সোনাবান বিবির গল্প

7b71c133-532b-42c1-8132-e26ad6fa9203মো. মোস্তাফিজুর রহমান::
সংবাদ সংগ্রহ করে ফিরছিলাম। সঙ্গে ছিলেন সহকর্মী মুজিবুর রহমান রন্জু। আসার পথে রাস্তায় দেখলাম কিছু মানুষের একটি জটলা। বিষয় কি জানতে এগিয়ে গেলাম। দেখতে পেলাম জটলার মধ্যে খানে দাঁড়ানো একজন বয়স্ক মহিলা কথা বলছেন। সবার কাছে গবাদি পশু হাঁস,মুরগী ও ছাগল। সবাই তার কাছ থেকে পশু চিকিৎসার পরামর্শ নিতে ভিড় করেছেন। তিনি বিগত ২৯ বছর ধরে এলাকার হাঁস মুরগী ও গবাদিপশুর চিকিৎসা করে চলেছেন। তিনি হলেন সোনাবান বিবি(৬৪)। কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের লঙ্গুরপাড় গ্রামে। স্বামী হারানো সোনাবান বিবি খালাতো ভাইয়ে আশ্রয়ে থাকেন। কিন্তু পরনির্ভর হতে চান বলেই এই বয়সে হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর চিকিৎসা সেবার ওপর বেসরকারী ভাবে প্রশিক্ষণ গ্রহন করে গ্রামে গ্রামে ছুটে সেবাদান করছেন। যাকে নিজ গ্রামবাসী ও আশপাশের গ্রামের লোকজন ‘হাসঁমুরগী ও পশুর ডাক্তার আপা‘ বলে ডাকেন। এমকি কি স্থানীয় উপজেলা প্রাণী সম্পদ বিভাগেও তিনি ডাক্তার আপা হিসাবে পরিচিত। গবাদিপশু চিকিৎসক সোনাবান বিবির মুখেই শোনা গেল তাঁর জীবনের গল্প।

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর ৭ বছর পূর্বে সোনাবান বিবির বয়স যখন মাত্র ১৫ বছর, তখনই বিয়ে হয় কমলগঞ্জের মাধবপুর ইউনিয়নের টিলাগাঁও গ্রামের রোস্তম আলীর সাথে। বিয়ের দুই বছরের মধ্যে জন্ম হয় মেয়ে করিমুন্নেসার। তার পর ছেলে জমির আলীর জন্ম হয়। ছেলে জমির আলীর জন্মের ২ বছর পর স্বামী রোস্তম আলী সোনাবান বিবিকে রেখে অন্য একনারীকে বিয়ে করে গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যান।

স্বামী চলে যাওয়ার পর মেয়ে ও ছেলে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে স্বামীর দেয়া ভিটেমাটি বিক্রি করে দেন। নিজে সংগ্রাম করে সন্তানদেরকে বড় করতে থাকেন। মেয়ে বয়স যখন ১২ বছর তখন সামাজিক চাপে মেয়ে অল্প বয়সে করিমুন্নেসা কে বিয়ে দিতে বাধ্য হন। মেয়ে চলে যাবার ছেলে জমির আলীকে বিয়ে করান কিন্তু ছেলেও একদিন মাকে রেখে বাড়ি হতে স্ত্রীকে নিয়ে শ্রীমঙ্গল চলে যায়। এ অবস্থায় একা হয়ে যান তিনি। সোনাবান বিবি আশ্রয় নেন খালাতো ভাই আবেদ আলীর কাছে। সেই থেকে জীবন যুদ্ধে নেমে পড়েন সোনাবান বিবি। তিনি মনে মনে চিন্তা করেন কি কাজ করবেন। একদিন এলাকার এক বধু তাকে পরামর্শ দেন পার্শ্ববর্তী এনজিও সংস্থা হীড বাংলাদেশ এর মহিলা সমিতিতে সম্পৃক্ত হবার। সালটি ১৯৮৭। তার পরামর্শে মহিলা সমিতির সদস্য হন ।

এ সমিতির মাধ্যমে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে হাঁস-মুরগির চিকিৎসার ওপর প্রাথমিক প্রশিক্ষণ গ্রহন করেন। সেই প্রশিক্ষন গ্রহন করে প্রথম অবস্থায় লঙ্গুরপাড় গ্রামে হাঁসমুরগীর সেবা শুরু করেন। উপজেলা প্রানী সম্পদ অধিদপ্তরে মাঠ পর্যায়ে ৩টি ইউনিয়ন নিয়ে একজন মাঠ কর্মী কাজ করেন। ফলে মাধবপুর ইউনিয়নের চিকিৎসার অভাবে গবাদিপশু পশু মারা যায়। এলাকাবাসী সরকারী ডাক্তার না পেয়ে সোনাবান বিবি কাছে হাঁস-মুরগিসহ গবাদি পশুর প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহনে ছুটে আসতেন। আস্তে আস্তে চার দিকে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন গ্রামে ডাক পড়তে থাকে সোনাবানবিবির। পরিচিত বাড়তে থাকে। গ্রামের মানুষজন তাকে পশু ডাক্তার আপা বলে ডাকতে শুরু করেন। মানুষের কাছে সাড়া পাওয়ায় সোনাবান বিবি গবাদি পশুর চিকিৎসা সেবার প্রশিক্ষন গ্রহনে আরো উদ্যোগী হন।

33fee8e4-7fcf-4db4-869c-f0433d54752aতিনি বিভিন্ন বেসরকারী পর্যায়ের সংস্থা হতে নিজ খরচে বেশ কয়েকটি প্রশিক্ষন নেন। তার পর এছাড়া ‘৯৮ সালে উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তৎকালীন কর্মকর্তা নুরুল ইসলামের আন্তরিকতায় প্রতিষেধকের ওপর চার দিনের প্রশিক্ষণ নেন। ২০১৩ সালে ক্রেলের সহায়তায় উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে সিলেট শহরের ছয় দিনের প্রশিক্ষণ নেন। এসব প্রশিক্ষন গ্রহনের কারনে তিনি এখন হাঁস, মুরগি, গরু ও ছাগলের রোগ প্রতিরোধে আগাম চিকিৎসাসেবা প্রদান এবং রোগবালাইয়ের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবায় অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছেন। দিন রাত ছুটে চলে এ বাড়ি হতে ওই বাড়ি। জটিল বিষয় হলে গ্রামবাসীর সঙ্গে তিনি উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে গিয়ে তাদের সাহায্য নেন। প্রায় ২৯ বছর ধরে গবাদিপশুর চিকিৎসা সেবা দিয়ে চলেছেন। তার কল্যানে এলাকার শত শত গবাদি পশু মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে। পশু মৃত্যুও হারও কমে গেছে। সোনাবান বিবিকে এলাকার মানুষ হাঁস মুরগীর ডাক্তার আপা বলে ডাকেন।

গ্রামবাসীও তাকে নিয়ে গর্ববোধ করেন। লগুরপাড় গ্রামের জব্বার মিয়া (৬০), আজব আলী (২২), পিয়ারুন বেগম (৩৫) বলেন, এই গ্রামে হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর একজন নারী ডাক্তার আছেন। সরকারী নিয়োজিত ডাক্তারকে তারা মাসে একবারও দেখেন না। সোনাবান বিবিও সারা ইউনিয়নে সেবা দেন। একটু খবর পেলেই ছুটে আসেন সোনাবান বিবি। তাঁর কাছে ওষুধ আছে, সেবাও পাওয়া যায়। টাকা বেশি খরচ হয় না। এলাকাবাসী সোনাবান বিবিকে সরকারী ভাবে ওষুধপত্র দিয়ে সহযোগীতা করার দাবী জানান।

গবাদি পশু সেবাদানকারী সোনাবান বিবি বলেন, প্রশিক্ষনে তিনি দক্ষতা অর্জন করেছেন। বাড়িতে ওষুধপত্র রেখে সেবা দেন। আর বেসরকারী সংস্থা ক্রেল তাঁকে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র সরবরাহ করে। প্রতিদিন তিনি ১৫০/২৫০ টাকা আয় করেন। এই আয় দিয়ে তিনি সংসার চালিয়ে চাচ্ছেন। তিনি মনে করেন, সরকারী পর্যায় হতে যদি আর্থিক বা ওষুধ দিয়ে সহযোগীতা করা হয় তাহলে বাকী জীবন পশুর সেবা করে যাবেন।

কমলগঞ্জ উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা বলেন, এ উপজেলার নয়টি ইউনিয়নে মাত্র তিনজন ভ্যাটেরিনারি সহকারী (মাঠকর্মী) দিয়ে সঠিকভাবে হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর চিকিৎসাসেবা প্রদান করা সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে সোনাবান বিবি অনেকটা সহায়তা করছেন।‘সোনাবান বিবির কাজে আমরাও খুশি। নিজের গ্র্রামসহ আশপাশের গ্রামে হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। জঠিল কোন সমস্যায় পড়লে আমাদের কার্যালয়ে যোগাযোগ করার মাধ্যমে চিকিৎসা দেন। সরকারী সহযোগীতা কথা জানতে চাইলে, তিনি বলে এটা কোন নিয়ম নেই।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: