সর্বশেষ আপডেট : ৩ মিনিট ০ সেকেন্ড আগে
শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

আমি কুলহারা কলঙ্কিনী

full_665580227_1463308595ডেইলি সিলেট ডেস্ক::
[জাহিদ সিরাজ, নৃবিজ্ঞানে স্নাতক আর মাস্টার্সে প্রথম হওয়া ইতিহাস বানানো তুখোড় এই ছাত্র মাস্টারি করতেন একসময়। এখন নিয়মিত গবেষণা করেন, কবিতা লিখেন। জীবিকা নির্বাহের তাগিদে লক্ষ্মীর সেবা করেন। গর্ভপাত বিষয়ে তার এই কাজ নিয়ে আন্তর্জাতিক সেমিনার পেপার হয়েছে, সমাদৃত হয়েছে। ভীষণ স্পর্শকাতর এই সাবজেক্ট নিয়ে এর আগে বাংলা ভাষায় কেউ কেউ লিখে থাকলেও আমাদের নজরে আসেনি। সারা মাঠ পর্যায়ে গবেষণার মাধ্যমে জাহিদ সিরাজ কাজটি করেছেন, ব্যাখ্যা করেছেন একজন দক্ষ গবেষকের চোখ দিয়ে, আবার বর্ণনা করে দিলেন নিখুত গল্পকারের হাত দিয়ে। গবেষণাটি আমরা নিয়মিত ভাবে প্রকাশ করে যাব]
পর্ব-১
যেখানে জীবনের যাত্রা

কতেক গুলো প্রশ্নের মাধ্যমেই বলা শুরু করি।
– এমন একটা স্পর্শকাতর বিষয়ে লিখায় আগ্রহ হলো কেন?

– বিষয়টা কী আদৌ বাংলাদেশের সামাজিক কোন সমস্যা বা ইস্যু?

– গর্ভপাত নিয়ে এর আগে আদৌ কী কোন লিখা হয়েছে?

– কোন প্রবন্ধ, নিবন্ধ, কোন গল্প বা উপন্যাসের বিষয়বস্তু কি গর্ভপাত ছিলো?

– যে শহরে আমার বেড়ে উঠা সেই শহরের অনেক ক্লিনিক, স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠান, ডাক্তার, নার্স জড়িত আছেন, কেউ কি কোনদিন এ বিষয় নিয়ে লিখার চিন্তা করছেন?

-আমার জ্ঞানমতে কেউ বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেননি কিংবা কেউ কি কোন গবেষণা করেছেন?

– নৃবিজ্ঞানের পড়াশুনা এ দেশে প্রায় তিরিশ বছর। তাত্ত্বিকভাবে কিছু লিখা আছে; বাংলাদেশের বাইরে; সেগুলো এথ্নোগ্রাফীক, কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু, বাংলাদেশ নয় কেন?

পৃথিবীর সব দেশেই গর্ভপাত একটি দৃশ্যমান সামাজিক বিষয়। মিশরীয়রা এর প্রথম উদ্ভাবক। পৃথিবীর অধিকাংশ নারীই নাকি গর্ভপাতের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান। কিন্তু, স্থান, কাল, সমাজ এবং সংস্কৃতির ভিন্নতায় গর্ভপাতের ফলাফল হয় ভিন্ন।

গর্ভপাতের প্রভাব পড়ে পরিবারে, পরিবারের সদস্যদের উপর। এমনকি সেই মায়ের ভবিষ্যত জীবনের চলার পথেও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে নিরাপদ গর্ভপাতের পরও মহিলাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি থেকে যায়। পরিসংখ্যান বলে, ২০ মিলিয়ন মায়েদের জীবনযাত্রা অনিরাপদ হয়ে পড়ে গর্ভপাতের ফলশ্রুতিতে আর প্রায় ৭০ হাজার মা মারা যান, এবং তাদের অধিকাংশই হলেন অনুন্নত বিশ্বের। এই ৭০ হাজারের অর্ধেক মারা যান বয়স ২৫ এর নীচে। মজার তথ্য হলো বিশ্বের প্রায় ২৬ ভাগ মানুষ বাস করেন, যেখানে গর্ভপাত আইনত নিষিদ্ধ [বাংলাদেশ সহ], ৪২ টি দেশের ডেটাবেস দেখে একটা সিদ্ধান্তে আসতে পেরেছি যে, গর্ভপাত স্টিগমা একটি বৈশ্বিক সামাজিক বিষয়।

বলাই বাহুল্য, এসব প্রশ্নের পেছনে অভিযোগী আমিও। এবং একই সাথে অভিযুক্ত।

দেশের বাইরে প্রায় অর্ধযুগ। মাস্টারিতেও নেই। পেটের দায়ে লক্ষ্মীর সেবায় নিয়োজিত। তবুও অভ্যাসের দায় বা দোষে সরস্বতীর সেবা করি কালেভদ্রে। প্রথম যখন শাহজালালের অধ্যাপক সঞ্জয় বিশ্বাসের সাথে কথা বলি যে, গর্ভপাত নিয়ে কিছু কথা বা কেইসস্টাডী শুনতে চাই। সঙ্গত কারণেই আসে বাজেটের কথা। মেলবোর্নের একটা সংস্থা বললো তারা কিছুটা দেবে। যেটা দিয়ে বড়জোর একমাসের ফিল্ডওয়ার্ক বা মায়েদের ইন্টারভ্যূ নেয়া সম্ভব। কি আর করা, সঞ্জয় ব্যক্তিগতভাবে আমার প্রতি খুবই অনুদার। সেই অনুদারের সুবাদেই বলল, ‘চিন্তা কইরেন না, দেখা যাক, আমিতো আছি।’ সঞ্জয়কে বললাম, “তাইলে চালাইয়া যা।”

গবেষণার জন্যে তিনজন স্টুডেন্ট সেই জোগাড় করলো। শুধু জানালো আপনার ‘র’ ডাটা আমি দিচ্ছি। বাদবাকী পরে হবে নে। এই তো শুরু। কিন্তু সিলেট থেকে দু’টো সংস্থা আমাদেরকে তথ্য দেয়নি। অন্য আরেকটি সংস্থা সাহায্য করে। এবং ঢাকা থেকে আরো একটি সংস্থাও। প্রথাগত গবেষণা নয় বলে আমি প্রথমেই কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি তিন শিক্ষার্থী ঢাকা থেকে আরও সাতজন ।

নৈতিক সমর্থন পেয়েছি সবারই। বিশেষতঃ Autralian Development Dialogue -ADD এর প্রতি। যেখানে আমি নিজেও গভীরভাবে যুক্ত।

ইন্টারনেট থেকে সাড়া পাওয়া মায়েদের দেয়া বিভিন্ন কবিতার লাইনগুলোই সংকলিত হয়েছে অধ্যায়ের প্রথমে। হয়তো কেউ আপন অনুভূতি জানিয়েছেন, বা নিজের অভিজ্ঞতার সাথে মিল পেয়েছেন বলেই কবিতার আশ্রয় নিয়েছেন। বিচিত্র, বিস্তৃত, হৃদয়ছোঁয়া সকল শব্দে বিম্বিত করেছেন মায়েরা তাঁদের গল্প। ফাহমিদা, সিলেট থেকে লিখেন। তাঁর কথা শেষ হলো কাইফ আজমীর সমস্বরে।

“আমার একমাত্র সম্পদ যন্ত্রণা।
কাকে উৎসর্গ করতে পারি এই সম্পত্তি?
আমি কোন জল্লাদকে দেখতে পাচ্ছিনা ফাঁসিমঞ্চের কাছে”

ব্যাক্তিগতভাবে আমি বেশ ঘাটাঘাটি করলাম। খুব করুণ ভাবে এইসব মায়েদেরকে চিহ্নিত করা হয়েছে। নৃবিজ্ঞানে, নৃবিজ্ঞানের বাইরের লিখাতে, সাহিত্যে, গবেষণাপত্রে। ওসব গবেষণা পড়তে মনে হয় যেন কোথাও কিছু লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এবং সেটার সম্ভাব্য কারণ হতে পারে গবেষণার দাতাদের জটিল সকল শর্তাবলী। যেহেতু আমাদের কাজে সেরকম কোন দাতা নেই কিংবা শর্তাবলী নেই; সেহেতু আমরা স্বাধীনভাবেই কাজ করতে পেরেছি।

গল্প সংকলন থেকে গবেষণা

প্রথমে আমাদের মূল প্লান ছিল কেবল যে সব মায়েদের লাইফ হিস্ট্রি নিচ্ছি কেবল তাঁদের কথাগুলো সংকলিত করে প্রকাশ করা। কিন্তু গর্ভপাত নিয়ে পড়তে মূল আইডিয়া থেকে অনেক সরে আসতে হয়। বিস্তৃতিও বাড়ে। যেমন, গল্পগুলো লিখার; জানানোর এবং প্রকাশ করার নৈতিক দায় কেন আমি নিচ্ছি। বর্তমান দুনিয়ার নৈতিকতা বিষয় পন্ডিত এবং ভাবুকেরা কি ভাবেন। এবং সর্বোপরি, গর্ভপাত বিষয়কে আমরা কি ‘নৈতিক’ বা ‘এথিক্যাল’ বলছি। নৈতিকতা কী সমাজ, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় ভিত্তিতে বিচার করি বা করা হয়? এসব চিন্তা নিয়ে কথা বলছিলাম অধ্যাপক পিটার সিংগার এর সাথে। বর্তমান জমানায় ‘নৈতিকতা’ বিষয়ে যিনি প্রবাদতুল্য মানুষ। বললেন, “বাপু, শুধু যদি গল্পগুলো লিখে ছেড়ে দাও, তাহলে তো এটা কেবল একজন ইয়ার ইলেভেনের ছাত্রের কাজ হয়ে গেল। এটার সাথে নৈতিকতার সম্পর্ক অনেক বেশী।” কয়েকটা বই হাতে ধরিয়ে বললেন, “পরে কথা হবে।”

সপ্তাহখানেক পর ইমেইলের বার্তা, “আস, কফির টেবিলে বসে কথা বলি।” এবার বললেন “নৈতিকতার প্রশ্নে তোমাকে আলাদা একটা চ্যাপ্টার করো”। এবার ধরিয়ে দিলেন George Devereux এর বিখ্যাত বইটা আদিম সমাজে গর্ভপাত (A study of Abortion in Primitive Societies). আদেশের সুরেই বললেন, “নৃবিজ্ঞানের চোখটাকে কাজে লাগাও।” সুতরাং তৃতীয় আর চতুর্থ অধ্যায় মূলতঃ পিটার সিংগারের আদেশেই।

অধ্যাপক পিটার সিংগারের সাথে তৃতীয়বার দেখা, তাঁরই এক সেমিনারে। এবার বললেন, “বাংলাতে লিখো; দেশের মানুষ আগে জানুক। সচেতনতা বাড়াবার জন্যে এর চেয়ে ভালো পথ নেই।”

পিটার সিংগার সম্পর্কে একটু বলে নিই। প্রিন্সটন এবং মেলবোর্নে যিনি ‘লরেট’ অধ্যাপক। চল্লিশটা বইয়ের জনক যেগুলো এথিক্স এবং দর্শনের পাঠ্য সারা পৃথিবীতে। টাইম ম্যাগাজিনে ২০০৫ সালে যাকে বলা হয়েছিল ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন। ভীষণ বিনম্র এবং হাস্যময় মানুষটির সান্নিধ্য না পেলে হয়তো বইটা কেবল গল্প সংকলনই হতে পারতো। আমার কাজ এগুচ্ছে শুনে ইমেইলে বললেন, “তোমার বইটা মীডের কামিং এজ অফ সামোয়া’রমতো হোক। সাহিত্য এবং নৃতত্ত্বের এক যুগপৎ যাত্রা। ক্লাসে এবং ক্যাফেতে।” আমি মুগ্ধ। বিমোহিত। পিটার সিংগার, আপনি দীর্ঘজীবি হোন।

অধ্যায়গুলোর আগের কথা

সুতরাং অধ্যায়গুলো সাজাতে হলো একটা ধারাবাহিকতা মেনে। ভূমিকায় দ্বিতীয় অধ্যায়। দ্বিতীয় অধ্যায়ে পুরো বইয়ের একটা ধারণা পাওয়া যায়। এখানে রিফ্লেক্ট করেছে সেইসব মায়েদের কথা যারা অনলাইনে রেসপন্স করেছেন। এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো এসেছে কিছুটা। স্থানাভাব এবং গল্পের পুনারাবৃত্তির জন্যে অনলাইনে দেয়া গল্পের সবগুলো কিংবা কোনটাই পুরোপুরি তুলে দিলাম না।

তৃতীয় ভাগে ‘গল্পের মরালিটি এবং গবেষণার নৈতিকতা।’ আমার বিচারে এটিই এই বইয়ের মূল অংশ হতে পারতো যদি এথিক্সের বিষয়টা একমাত্র বিষয় হতো। নৈতিকতার আলোচনায় আমরা সকলেই পূর্ণ দায়বোধতা রেখেছি। লিখায়, বলায় এবং শোনায়। এমনকি তাঁদের কাছে যাবার প্রক্রিয়াতেও থেকেছি স্বচ্ছ এবং মেনেছি প্রতিষ্ঠিত নিয়মনীতি। এথিকস-এর সর্বশেষ সংযোজন হলো, কোন গবেষণা বা লিখার মূল উত্তরদাতাদের কাছে চূড়ান্ত লিখা বা সংকলনের একটা কপি পড়তে দেওয়া। যাঁরা পড়তে অক্ষম তাঁদেরকে পড়ে শুনানো, তাদেরই মাতৃভাষায়, প্রয়োজনে অনুবাদ করে হলেও। নৈতিকতার এই চূড়ান্ত নীতি আমরা যত্ন নিয়েই পালন করেছি। তাঁদের মতামতও আমরা গ্রহন করছি গুরুত্ব দিয়ে। তাঁদের অংশগ্রহনটাও ছিল স্বত:স্ফূর্ত।

চতুর্থ অংশ আলোচিত হচ্ছে বাংলাদেশের সমাজ কিভাবে গর্ভপাত করানো মায়েদেরকে দেখে, কেনোইবা মায়েরা বলছেন কলঙ্কিনী বা স্টিমাটাইজড। মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা বা আঘাত থেকে জন্ম হচ্ছে স্টিগমার। আর এই স্টিগমার শিকড় পূঁতে রাখা আছে আমাদের মাঝে। আমরা মানে আপনিও। মায়েরাও। ডাক্তার, নার্স, ম্যানেজার, আয়া, বুয়া, বাবা, মা, স্বামী, সঙ্গী, আমরা প্রত্যেকেই হয়ে যাই এই সামাজিক সিস্টেম বা নিয়মের সক্রিয় এজেন্ট। যেমনটি বলছেন মিশেল ফুঁকো। ব্যক্তিক চরিত্রটি নির্ধারিত হয়ে যায় বড় চালিকা শক্তি দ্বারা। যেমন: মেডিক্যাল সিস্টেম, অর্থনীতি, রাজনৈতিক কাঠামো।
অন্যদিকে, এইসব বাধা উপেক্ষা করেও মায়েরা গর্ভপাত করাচ্ছেন। এখানে দুটো বিপরীত ধারা উঠে আসে। যেমন, বাংলাদেশে গর্ভপাত করানো আইনত নিষিদ্ধ। তবু গর্ভপাত করানো হচ্ছে, কলঙ্কিনী হবার ভয়ে। গর্ভপাত করানোর পরেও হচ্ছেন কলঙ্কিনী। সমাজের ও স্বজনের মাঝে একটু ফাঁকা জায়গা আছে। আবার, গর্ভপাত করানোর প্রক্রিয়ায় কিংবা, একজন মাকে রাজী করানো থেকে পুরো প্রক্রিয়ার শেষ পর্যন্ত একজন মায়ের সিদ্ধান্ত নেবার জায়গাটা খুব বেশি নেই। এবং শারিরীক প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যাবার পরও থেকে যায় কলঙ্কের তিলক চিহ্ন।
যেখানে আমরা দেখি, তাদের স্টিগমাটা থেকেই যায়। গর্ভপাত করানোর আগে, বিশেষত অবিবাহিতদের বেলাতে, যে স্টিগমা, গর্ভপাতের পর সে একই স্টিগমা আসে সমাজ থেকে। যদিও এটা অদৃশ্যমান, এবং এখানেই আমরা আরভিং গফম্যানকে স্মরণ করি। কিভাবে একটা বিশেষ প্রেক্ষাপটের জন্য মায়েদের উপর কলঙ্ক চিহ্ন সমাজ থেকে আরোপিত হয়। একই সাথে আমরা দেখার চেষ্টা করবো ডিসকোর্স এনালাইসিস এর মাধ্যমে। কিভাবে শক্তিশালী শব্দসমূহ থেকে অবদমন তৈরী হয়। এই বইয়ে আমরা দেখবো, মুসলমান অধ্যুষিত বাংলাদেশে ইসলাম কি বলছে। একই সমান্তরালে হিন্দু ধর্ম মতও দেখার চেষ্টা করেছি।

“আমি কুল হারা কলঙ্কিনী”- অমরত্ব পাওয়া শাহ আব্দুল করিমের এ চরণ উল্লেখ করেছেন ১৩১জন মা। শব্দান্তে, বাক্যে, কথায়, কোন না কোন ভাবে উঠে এসেছে মায়েদের নিজেদের মুখে তাঁরা (স্টিগমাটাইজ) কলঙ্কিনী । তাঁদের গল্পগুলো এই অধ্যায়েই সংকলিত। এবং এই শিরোণামে। একজন মা উল্লেখ করেছেন খাজা ফরিদকে। মুলতানী ভাষার এ গীতল কবির কাছেই আশ্রয় পেয়েছেন একজন মা। সিলেট অঞ্চলের অনেক মা-ই সান্তনা খুঁজেছিলেন বাংলাদেশের গীতল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমে।

পঞ্চম অধ্যায়টির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে; আমাদের কাজে যে সব মায়েরা অংশগ্রহন করেন, তারা সবাই বাংলাদেশের। প্রায় সবাই মুসলমান। সুতরাং, মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার এইসব মায়েদের গল্পে, অভিজ্ঞতায় আমরা দেখছি একটি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে ধর্ম। এমনকি Critical Discourse Analysis-CDA- আমরা ফলো করি, সেখানে মায়েদের একশন, কাজ, আচার আচরণকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এবং এগুলো নিয়ে ভাবতে আমরা ইসলামিক ডিসকোর্সগুলো খুঁজতে থাকি। কেবলই পবিত্র কোরান বা মহানবী (সঃ) এর হাদীস নয়, বিশেষজ্ঞরাও অনেক মতামত দিয়েছেন। যা আমরা তৃতীয় অধ্যায়ে আলোচনার সূত্রপাত করে থেমে যাই। মনে হলো; আলাদা একটি অধ্যায় আমাদেরকে লিখতেই হবে। কারণ, এতো বেশী সেকেন্ডারী ডেটা যে, ওখান থেকে এক অনুচ্ছেদে বা পৃষ্ঠায় লিখে পরিষ্কার কোন ধারণা দেয়া যাবেনা। গর্ভপাত সংক্রান্ত ইসলামীক ডিসকোর্স নিয়ে আমাদের পঞ্চম অধ্যায় সঞ্চরণশীল হয়। আরো সংবেদনশীল। গর্ভপাত নিয়ে বিতর্ক বর্তমান মুসলিম দুনিয়াতে দ্রষ্টব্য।

ষষ্ঠ অধ্যায়ে যে সব মা’দের কথা উঠে এসেছে তাঁরা প্রত্যেকেই সরাসরি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সময় দিয়েছেন। এবং তাঁদেরকে এই বইয়ের মূল পান্ডুলিপির কপি পড়তে দেয়া হয়। তাঁদের মতামত গুরুত্ব সহকারে মূল্যায়িত হয়েছে। আমাদের সযত্ন চেষ্টা ছিল গল্পগুলো অবিকৃত রাখার। আমরা সেটা পেরেছি। মায়েরা যখন এই অধ্যায় পড়েছেন; কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন, আবেগে কেঁদেছেন কেউ কেউ। আমরা মনে করছি আমরা স্বার্থক বইটি লিখাতে, বলাতে। তাঁদের না শুনা না বলা কথাগুলো সবাইকে জানাতে। অন্যকথায়, এ অধ্যায় হলো এই বইয়ের মূল স্তম্ভ। বাদবাকী অধ্যায়গুলো সাজানো হয়েছে এ অধ্যায়কে কেন্দ্র করে।

‘অদৃশ্য পালকের সম্ভার’- আমাদের সমাপ্তি অধ্যায়। পরবর্তী অনুসন্ধানী মন খুঁজে নিবেন অদৃশ্য পালকগুলো। কোন নৃবিজ্ঞানী, সমাজ বিজ্ঞানী, উন্নয়ন কর্মী বা সমাজকর্মী। কিংবা কোন সাহিত্যিক, সাংবাদিক। আমাদের সীমিত সময়, টাকা পয়সা, শ্রম দিয়ে এই পর্যন্ত রেখে গেলাম। হয়তো কোন নতুন জানালা। পর্দার ও পাশে আরো কিছু কেউ না কেউ খুঁজতে আগ্রহী হবেন। নিকট বা দূর ভবিষ্যতে। আমরা এখানে একই সমান্তরালে শ্রোতা এবং বক্তা। কোন সক্রিয় কথকের পক্ষে স্থির হয়ে থাকা সম্ভব নয় মনে করেই আমরা ভাবছি আরও কেউ আসবেন আমাদের কথাকে এগিয়ে নিতে।

একটি অর্থহীন উত্থান হবেনাতো (!)

তর্ক বিতর্ক যা আসবে তা আমরা এড়িয়ে যাবো না। নৈতিকতার মানদণ্ড আমাদের হাতে নেই বিধায় আমরা পাঠকের হাতেই ছেড়ে দিচ্ছি। আমাদের কাজ জানালার খিড়কীগুলো খুলে দেয়া; এবং আমরা তাই করছি।

এবং আবারো আমরা সবিনয়ে জানাই যে, অনুরুদ্ধ বা আদিষ্ট হয়ে নয়, স্বতঃসিদ্ধ অনুপ্রেরণা থেকেই কাজটাতে হাত দেয়া, এবং শেষ করা। বইটি আত্ম-উন্মোচনের, মায়েদের আর্তির, মায়েদের অব্যক্ত মনাবিস্কারের।

গবেষণার সহকারীদের বিদগ্ধ মনের পরিচয় পেয়েছি। সহজ সরল ভাষা, গুঢ় দৃষ্টি, আলাদা আলাদা উপাখ্যানের বর্ণনা, মনের মত করে কানে কানে বলার মত নরম আর স্পষ্ট শব্দ চয়ন এবং আত্মপ্রত্যয়ী, বিজ্ঞতার পরিপূর্ণ প্রকাশ আমি দেখেছি। সকলের, বিশেষ করে অধ্যাপক সঞ্জয়ের আন্তরিক উচ্চারণ, মূল্যায়ন এবং বান্ধব ইমেজের প্রতিফলন ছিল বলেই এতোটা নিয়ে আসতে পারা।

বইটি কোন সৌখিন সৌন্দর্যতত্ত্ব প্রয়াসী নয়। বরং দুঃখ বেদনাকে পরিপূর্ণভাবে দেখার চেষ্টা। অনন্ত দুঃখের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাদেরকে লিখে যেতে হয়েছে। বইটার পাতায় উঠে আসে দুঃখধ্বনি। বইটার দশদিক আন্দোলিত হয় প্রাণের লুক্কায়িত মানবতার আকুল আতঁতি।

গল্পগুলো দেশজ। আঞ্চলিক। ভৌগলিকতার হিসাবে ছোট্ট একটি অঞ্চলের। কিন্তু, পরতে পরতে প্রতিধ্বনিত হয় নির্দয় বিচ্ছেদের। বাংলার মা-সন্তানের নাড়ি ছেঁড়ার কথা হয়তোবা হিমালয়, আল্পস পেরিয়ে একাকার হয়ে যাবে অন্য মায়েদের সাথে। স্থানীক বাংলার গল্পগুলো হয়ে যায় মরুচারী, যাযাবর আর নিশাচর। প্যাস্টোরাল, এই পৃথিবীর পথে পথে।

সহজ সরল গল্পগুলোর গতরে তীব্র শোক মাখানো। সহজিয়া বাংলা বর্ণগুলো যেন এক একটা গ্রানাইটে খোদাই করা যন্ত্রণার ভাস্কর্য। বিষাক্ত আর নীল। সমাজ আর সংস্কৃতির পরিহাসপূর্ণ চোখ লেগে আছে অক্ষরগুলোর সর্বাঙ্গে। সাহিত্য আর নৃতত্বের ঐতিহ্যে প্রসারিত সংকলনটিতে তাই আমরা তথাকথিত ডেটা বা মূল তথ্যকে তত্ত্বের সাথে একাকার হয়ে যেতে দিচ্ছিনা। ফলেই স্পষ্ট হয়ে উঠে গভীর মমতার গল্প। তত্ত্বীয় আর বিদ্যালয়ী ছোঁয়া থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।

মায়েদের আর্তের মধ্যে আমি ‘আত্মার’ এনিগমা শুনেছি; গর্ভপাতের মাধ্যমে ডাক্তার সাহেবরা আসলেই কি কিছু কোষপিন্ড সরাচ্ছেন, নাকি একটি স্বাধীন, সরব, স্বতন্ত্র জীবনটাকেই মুছে দিচ্ছেন আজীবনের জন্যে?

পরবর্তী কেউ লিখবেন; রাজনৈতিক ভোটের হিসাবের বাইরে যেয়ে কথা বলবেন; পুঁজিপতিরা তাদের ব্যবসার লাভালাভকে একপাশে রেখে মানবিক আর নৈতিক হয়ে উঠবেন এমন আশা আমরা করি। মনে করি, এটার জন্যে কেবল নৃবিজ্ঞান নয়, অন্যান্য ডিসিপ্লিন থেকেও আসবেন বিজ্ঞ অধ্যপকেরা; কথা বলবেন প্রাণ খুলে, দাতাদের শর্তাবলীর শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে। কিন্তু, নীতিমালা তৈরীর আগে যে প্রশ্নটির সমাধান হওয়া উচিত-

ফার্টিলাইজেশনের ১৪ দিনের বা ৭ দিনের মধ্যেই ভ্রুণটিকে আমরা একজন মানব শিশু বলবো নাকি আরো পরে; ৪০ দিন কিংবা ১২০ দিন? ভ্রুণটিকে একটি মানব স্বত্বা হিসাবে কোন সময় থেকে হিসাব করবো?

এ প্রশ্নের উত্তরেই আমরা সমাধান পাবো; একটি পলিসি তৈরী করার; কিংবা একটি জাতীয় নীতিমালার। তবুও উপসংহারে, ব্যক্তিগত মতামত দিয়ে রেখেছি; যেটার ‘সম্পূর্ণ’ দায় আমার।

আপনারা আরো লিখুন, জানান, গবেষণা করুন, আমি কেবলই পালকটাকে দেখিয়ে দিলাম; বা আলতো ছুঁয়ে দিলাম। আমার বিশ্বাস, আপনারাও এগিয়ে আসলে এটি একটি অর্থহীন উত্থান হবেনা।

শাহ মো: এমরান হোসেন জুমন, মো: রাজেদ আহমদ প্রুফ দেখার চরম বিরক্তিকর কাজটি করেছে। কৃষ্ণা দে, পারমিতা দত্ত কুলসুমা শাবিতে পড়ুয়া আমার বড়লেখার বোনেরা, সালাউদ্দিন মল্লিক, এফ.আই. ভি.ডি.বি ব্যস্ততার মধ্যে দিয়েও তাঁর সময় দিয়েছেন, কম্পিউটার দিয়েছেন। এবং বিশেষত: ৫ম অধ্যায় ছিলো মূলত: ইংরেজীতে অন্য এক জার্নালের জন্যে লিখা, সে রাত জেগে মাতৃভাষায় তর্জমা করেছে। লম্বা এই মানুষটিকে ধন্যবাদ দিয়ে আমার মত বাইট্টা করলাম না। ধন্যবাদের আনুষ্ঠানিকতা নয়, এই নাম গুলোর কাছে ঋণ শোধবার নয়। [শোধ করতাম সামর্থ্য থাকলেতো!!! হা হা] ভগ্নিপতি পারভেজ বড় বড় মাছের সাপ্লাই আর ভ্যেনু দিয়ে বেহুদাই কৃতজ্ঞ করে রাখলো।

———————————————————————————–

George Devereux (1976)
Aahman and Shah (2008)
Who (2003)
Segdh et.al (2007)
Who (2009,p.13)
WHO (2007)
Centre for Reproductive Rights (2008)

৫ম অধ্যায়ে এ বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে শাহ আব্দুল করিম এবং খাজা ফরিদের মাঝে প্রচুর মিল আছে। অতিন্দ্রীয়বাদ আর আধ্যাত্ববাদ দু’জনের দর্শন। বৃষ্টি আর পানি দু’জনের উপজীব্য। দেহতত্ত্ব দ’জনের আরক। গৃহত্যাগী মানসিকতা দু’জনের মননে। আগ্রহীরা পড়তেই পারেন। (চলবে)

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: